ডুবায়ে রাখে মায়ায়’ : মৃত্তিকা সহিতা

দেড় দশক আগে এক পড়ন্ত গ্রীষ্মে পৌঁছেছিলাম মার্কিন মুলুকের নিউইয়র্ক শহরে। তখনো কমলা রোদে উজ্জ্বল দিন, স্বচ্ছ নীল আকাশ, বাতাসে নেই শীতের দূরতম আভাস। স্বদেশের কাছেপিঠের দেশগুলোতে আগে বহুবার বেড়াতে গেছি বটে, কিন্তু পশ্চিমে সেই আমার প্রথম পদার্পণ। ফলে, নতুন দেশ দেখবার চাপা উত্তেজনা যে ছিলনা তা নয়, কিন্তু পাশাপাশি উদ্বেগ-শংকা, বাড়ির জন্য মন কেমন করাও পাল্লা দিয়ে তোলপাড় করছিল ভেতরে। এবারেরটা তো আর অল্প কদিনের মামুলি ভ্রমণ নয়। এ একেবারে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রা। দেশ থেকে অতো দূরে, তায় নয় নয় করেও পাক্কা দু’বছরের ধাক্কা।

মোদ্দা কথা হলো, ফুলব্রাইট স্কলারশিপ পেয়েছি কিছুদিন আগেই, তাই এদেশে আগমন আমার দ্বিতীয় মাস্টার্সটি করবো বলে। সঙ্গে অবশ্য বরও এসেছে, পিএইচডি গবেষক হিসেবে ওহায়োর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে (পড়ালেখার নেশা আমাদের ছাড়ে না!)। আমি ভর্তি হয়েছি নিউইয়র্কের উপকণ্ঠে সারা লরেন্স কলেজে (১৯২৬ সালে স্থাপিত), পড়বো নারীর ইতিহাস। বলে রাখা ভালো, এটি বিশ্বের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে নারীর ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চালু করা হয় সেই ১৯৭২ সালে।

আমার অ্যাডমিশনের খবর যখন পৌঁছেছিল ঢাকায়, সেই হলুদ বড় খামের মধ্যে কলেজের প্রসপেক্টাস আর ইত্যাকার জরুরি কাগজের সঙ্গে ছিল ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধানের হাতে লেখা একখানি চিঠিও। সে চিঠি বহরে কম হতে পারে, কিন্তু আন্তরিকতার পারদে চড়া। ভর্তির যোগ্যতা অর্জনের জন্য উষ্ণ অভিনন্দন আর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামীর পথচলায় অশেষ শুভকামনা বয়ে আনা সে কয়েকটি লাইন জীবনের এক বাঁকবদলের মুখে দুরুদুরু বক্ষে আমি অনুবাদ করে নিয়েছিলাম “তোমার আছে তো হাতখানি” – এই নিশ্চিন্তির অভয়বাণীতে।

দেশ থেকে দীর্ঘ প্লেনযাত্রার ক্লান্তি, আর তার দোসর প্রবল জেটল্যাগের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে একদিন রওনা হওয়া গেল কলেজের উদ্দেশ্যে। নিউইয়র্কে এসে উঠেছিলাম বাঙালি পাড়ায় এক আত্মীয় বাড়িতে। তাঁরা খুবই সাদরে অভ্যর্থনা করেছেন, তবে তাঁদের ঠিকানা থেকে আমার নতুন শিক্ষালয় পর্যন্ত পৌঁছতে অন্তত বার তিনেক ট্রেন বদলে প্রায় আড়াই ঘন্টার ধাক্কা।  প্রথম দিন আমরা দুজনে একরকম এডভেঞ্চার করেই শেষমেশ গিয়ে উপস্থিত হলাম গন্তব্যে। তবে ট্রেন থেকে নেমেই সব ক্লান্তি-উদ্বেগ যেন ধুয়ে-মুছে গেল। জায়গাটা এত মন-ভালো করা যে বলার নয়। শান্ত-সুন্দর-সবুজ, পথে পথে ফুটে আছে নানা রঙের ফুল, ছবির মতো সাজানো সামনে ছোট বাগানসমেত এক একটি নিচু বাড়ি। কলেজ ক্যাম্পাস খুব বড় নয়, উঁচু-নিচু এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন বিভাগ, প্রশাসনিক দপ্তর ইত্যাদি। ভবনগুলো স্থাপত্যিক সৌন্দর্যের মূর্তরূপ – চোখের আরাম, মনের শান্তি ।

কিন্তু, আমার বিভাগে পৌঁছে শুনি আমার সেই বড় ভরসার পত্রদাত্রী, ইতোমধ্যেই ভারমুক্ত হয়েছেন, দায়িত্বে ফিরেছেন মূল পদাধিকারী। বুকের দুরুদুরু আবার বাড়ল বুঝি। ভারপ্রাপ্ত সেই বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে পরে অবশ্য প্রথম বর্ষেই ক্লাস পেয়েছিলাম। আমার নামটা বহু কষ্টে রপ্ত করেছিলেন, ‘গার্ল উইথ আ সুইট ফেস’ বলেও পরিচয় করিয়েছেন কখনো-সখনো! খুব জমাটি মানুষ, তীক্ষ্ণ রসবোধ, যত্ন করে পড়াতেন। কত কী যে শিখেছি তাঁর কাছে! বলা যায়, ইতিহাস নিয়ে গবেষণার একেবারে প্রাথমিক পাঠ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের শুরু তাঁর ক্লাসেই। তাঁর গল্প, ক্লাসের অভিজ্ঞতা আরো বিশদভাবে হয়তো লিখবো পরে কখনো, কিন্তু আজকের এ লেখা তাঁকে নিয়ে নয়।

একটু থিতু হয়ে একদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে বিভাগীয় প্রধানের সাথে দেখা করে প্রাথমিক আলাপ-পরিচয় সেরে এলাম। ইনি অধ্যাপক প্রিসিলা মুরোলো; নাতিদীর্ঘ উচ্চতা, মেদহীন ছিমছাম গড়ন আর কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা এক মাথা সাদা রেশমের মতো চুলের মানুষটি দৃষ্টি কাড়েন প্রথম দেখায়ই । আরেকটু আলাপে মন কেড়ে নেয় তাঁর সম্মোহনীয় বুদ্ধিদীপ্ততা আর প্রাণখোলা হাসি। খুঁটিয়ে জানতে চাইলেন আমার যাবতীয় বৃত্তান্ত; সাথে জানিয়ে রাখলেন যেকোনো প্রয়োজনে-সমস্যায় আমার জন্য তাঁর দুয়ার সর্বদাই খোলা। এমন গালভরা বুলি বলে তো কতজনই, কিন্তু এ যে কেবল কথার কথা হয়েই রইবে না, তা কি আর জানতাম তখন!

ক্লাস শুরু হয়ে গেল অল্প ক’দিনের মধ্যেই। এই প্রথম দেশের বাইরে পড়তে আসা, এখানকার ধরন-ধারণ জানিনা কিছুই, তাছাড়া আমার এ পর্যন্ত পড়ালেখা আগাগোড়াই বাংলা মাধ্যমে – সবটা মিলিয়ে নানান রকমের দুর্ভাবনা যে মনে ভিড় করেনি তা নয়। যদিও, আজ এ কথা জোর দিয়েই বলতে পারি, শিক্ষাজীবনের নানান ওঠাপড়ায় এ উপলব্ধিই দৃঢ়তর হয়েছে যে, নিজের মাটির মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়ানোয় বরং বাড়তি অনেক সুবিধা পেয়েছি। ছোটবেলা থেকে প্রচুর পড়ার আগ্রহ-অভ্যাসে ভাষার বুনিয়াদ শক্ত হয়েছে, সাহায্য করেছে চিন্তার পরিধি-সক্ষমতা বাড়াতে, তা প্রকাশেও মিলেছে বাড়তি সুবিধা। আর এই সবই দ্বিতীয় (বা তারও বেশি) ভাষা রপ্ত করার চ্যালেঞ্জকে সহজ করে দিয়েছে অনেকটাই। ভাষা নয়, বিদেশে পড়ালেখায় বরং, আমাদের উচ্চশিক্ষা মৌলিক এবং জটিল ভাবনার ও তদনুযায়ী লেখার সুযোগ ও প্রশিক্ষণের নিদারুণ অভাবটাই ভুগিয়েছে পদে পদে। তবে যেহেতু কঠিনকে মোকাবেলায় ঘাবড়াইনি কখনো আর পিছ’পা হইনি পরিশ্রমে, ফলে বহু বিচিত্র বিপর্যয় সত্ত্বেও প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত কূলে তরী সফলভাবেই ভেড়ানো গেছে।

সেসব তো ছিলই, কিন্তু আমার জন্য তার চেয়েও বড় এক দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো কলেজের কাছাকাছি থাকার একটা জায়গার ব্যবস্থা করা। বর ততদিনে চলে গেছে ওহায়ো, ওর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, ক্যাম্পাসে বাড়িও পেয়ে গেছে। কিন্তু আমার নিজের বাসস্থানের তখনো কোনো গতি হয় নি। এখানে ক্লাস শেষ হতে হতে কোন কোনদিন সন্ধ্যা সাতটা, একদিন এমনকি রাত্রি নটাও বেজে যায়। তারপর অতো রাতে ট্রেনে নিউইয়র্কের আত্মীয়ের আবাসে ফেরাটা, খুবই অসুবিধাজনক লাগছিল। কিন্তু ডরমিটরিতে ঘর ফাঁকা নেই। অন্য কোনো জায়গাও মিলছিল না ।

এর মধ্যেই খোঁজ পেলাম কলেজের কয়েকজন মেয়ে মিলে কাছাকাছি একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করেছে। সেখানে ঘর খালি আছে জেনে ইমেইলে যোগাযোগও করেছি। প্রথমটায় বেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও পরে সামনাসামনি কথা হলো যখন, অত্যন্ত রূঢ়ভাবে এড়িয়ে গেল। বুঝতে অসুবিধা হলোনা, উন্নতি-প্রগতির রমরমার দুনিয়ায় এই একুশ শতকেও বর্ণবাদ আজো তার দাঁত-নখসমেত প্রবলভাবেই বিরাজিত, সুযোগ পাওয়ামাত্রই যথামাহাত্ম্যে যার আত্মপ্রকাশ ঘটতে দেরি করে না।

 কিন্তু, বিপদে পড়লে হাত বাড়িয়ে দেবার মানুষেরাও যে আছেন, থাকেন চারপাশে সেটাও তো সত্যি। সেই যে, সকল প্রয়োজনে সদাই দুয়ার খোলার বরাভয় দিয়ে রেখেছিলেন যিনি, তিনিই এলেন ত্রাতা হয়ে। এর মধ্যে কথাপ্রসঙ্গে প্রিসিলার (সিনিয়র অধ্যাপক বটে, কিন্তু নাম ধরে ডাকাতেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য) কানে পৌঁছেছে আমার সংকট। দেরিমাত্র না করে জানিয়েছেন, দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, যতদিন না পর্যন্ত থাকার জায়গার সুরাহা হচ্ছে, দেরি করে ক্লাস শেষ যে বারে, সে রাতটি ওর বাড়িতেই আমার থাকার ব্যবস্থা পাকা! এই অল্প ক’দিনের পরিচয়ে এতোটা সত্যিই আশা করিনি। মন ভরে উঠেছিল – কৃতজ্ঞতায়, বিস্ময়ে এবং প্রায়ই টোল খেয়ে যাওয়া মানুষের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস-সম্মানে।

 সেই কথাই রইলো। পরের সপ্তাহে ক্লাস শেষে বেরিয়ে দেখলাম টকটকে লাল রঙের স্টাইলিশ গাড়ি (গ্রীষ্মে কি বসন্তে তার হুড খুলে চালানো হতো) নিয়ে বাইরে অপেক্ষারত প্রিসিলা। বাকিদের অবাক দৃষ্টির সামনে দিয়ে স্মার্টলি হেঁটে উঠে বসলাম ওর পাশের সিটটিতে। স্বীকার করতে দোষ কী, বাইরে যা-ই দেখাক না কেন, চিরকালের মুখচোরা আমি তখন মনে মনে কিন্তু বেজায় অপ্রস্তুত (স্বস্তি-সংকোচ-গর্ব- অনিশ্চয়তা – কীসে যে নয়, তা বলা মুশকিল)!  কয়েক মিনিটেই আমরা পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে, বইপত্রে ঠাসা ওদের ছিমছাম দোতালা বাড়িটিতে।

প্রথম দিনের কথাই বেশি মনে আছে, আলাপ হলো প্রিসিলার বরের সাথে, তিনি সহাস্যে অভ্যর্থনা জানালেন। আমাদের জন্য রান্না করে রেখেছিলেন রাতের খাবার। এর নাম চিলি – এখানে খুব জনপ্রিয়। প্রচুর টমেটোসমেত বিনস (কিডনি বা ব্ল্যাক), অন্যান্য সবজি ও মাংস দিয়ে এক জাতীয় স্ট্যু, বেশ উপাদেয়। তিনজনে মিলে গল্প করতে করতে খাওয়া হলো, খাওয়ার পর আমিও হাতে হাতে সাহায্য করলাম গুছিয়ে নিতে। তারপর ওদের বাড়তি ঘরে পরিপাটি বিছানায় আরামের ঘুম দিয়ে সকালে আবার পুরনো ডেরায় ফেরা। আমাদের প্রাচ্যদেশীয় সংস্কৃতিতে গুরুর বাড়িতে থেকে শিক্ষালাভের ঐতিহ্য তো সুবিদিত। কিন্তু, বিদেশ-বিভুঁইয়ে, অধ্যাপকের বাড়িতে, প্রায় অপরিচিত দূরাগত এই আমাকে যে উষ্ণ আতিথেয়তায়, নিখাদ আন্তরিকতায় তাঁরা আবাহন এবং আপ্যায়ন করেছিলেন, তা অভাবনীয় মনে হয়েছিল। সে সন্ধ্যা-রাতের স্নিগ্ধ-জ্যোতিস্মান স্মৃতি চিরকাল মনে রয়ে যাবে। (আমার বাসস্থানের সমাধান হয়েছিল সত্ত্বরই, সেও আরেক গল্প, আপাতত তোলা থাক অন্য কোনো দিনের জন্য।)

দেখতে দেখতে প্রথম বর্ষ উতরে উঠে গেলাম দ্বিতীয় বর্ষে। এই বছরের শেষে আমাদের জমা দিতে হবে থিসিস, ফলে মনোযোগ সেদিকেই নিবদ্ধ। আনুষ্ঠানিকভাবে আমার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অন্য একজন অধ্যাপকের নাম থাকলেও বাস্তবে প্রিসিলার নিবিড় পথনির্দেশনাই ছিল মূল পাথেয়। এমনিতে অ্যাকাডেমিশিয়ান হিসেবে ওঁর খ্যাতি লেবার হিস্টোরিয়ান হিসেবে, এক্টিভিস্ট হিসেবে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকাও প্রশংসিত। কিন্তু, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ না হলেও থিসিসের জন্য আমার নির্বাচিত বিষয় “বৃটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে নারীর ভূমিকা” নিয়ে তাঁর উৎসাহের কোনো কমতি ছিলনা। থিসিসের কাঠামো দাঁড় করানো থেকে শুরু করে এর পরিশিষ্টের নানান খুঁটিনাটি পর্যন্ত সমস্তটা নিয়ে দিনের পর দিন মাথা ঘামিয়েছেন। নিজের সংগ্রহের বই কখনো ধার, কখনো উপহার দিয়েছেন; সত্যি সত্যি আলো হাতে আমার সাথে পথ চলেছেন আগাগোড়া।

একবার আমি নিজে থেকেই খাটনি করে বহু বইপত্র ঘেঁটে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের পরিচিত-স্বল্প পরিচিত বিপ্লবী নারীদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করছিলাম পরিশিষ্টে যুক্ত করা যেতে পারে ভেবে, আমাদের নিয়মিত মাসিক মিটিংএ তা দেখিয়েছিলাম প্রিসিলাকে। আমার সেই চেষ্টা-পরিশ্রম ওঁর এতো ভালো লেগেছিল, ক্লাসে সবার সামনে জ্বলজ্বলে মুখে বলেছিলেন সে কথা। বলা হয়ে ওঠেনি কখনো, আমি কেবল আমার প্রতি ওঁর বিশাল-অপরিমেয় দানের যোগ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলাম মাত্র। এই-ই বোধহয় প্রকৃত শিক্ষক, যিনি বিদ্যার্থীর মনে অলক্ষ্যেই উপ্ত করেন নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার প্রেরণা।

একদিনের কথা বলি। আমাদের কাজ দেয়া হয়েছিল, থিসিসে ব্যবহার করছি এরকম অন্তত দুটি প্রাথমিক উৎস ও তার পর্যালোচনা ক্লাসে উপস্থাপন করা। আমার বাছাইয়ের মধ্যে একটি ছিল, ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযানের অব্যবহিত আগে বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের অনবদ্য রচনা ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। আমরা তো জানি, এই দুঃসাহসিক অভিযানে সাফল্যের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রীতিলতা, ফিরবার পথে আহত হলে শত্রুর হাতে ধরা না দিয়ে পটাসিয়াম সায়ানাইড পানে মৃত্যুবরণ করেন। ইংরেজি ভাষান্তরে আমি ক্লাসে পড়ে শুনিয়েছিলাম, তাঁরই লেখা থেকে, যেখানে তিনি সরল অথচ ওজস্বী ভাষায়  বলছেন, “দেশের মুক্তিসংগ্রামে নারী ও পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়াছিল। যদি আমাদের ভাইয়েরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন উহা পারিব না?” আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে মাত্র একুশ বছরের এক বাঙালি তরুণীর সমাজে বিদ্যমান gender discrimination এর বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ, মাতৃভূমির এক কঠিন দুঃসময়ে অমিতসাহসিকতার পরিচয়, এবং সবশেষে অকাতরে আত্মবিলোপ – এইসব কথাই তুলে এনেছিলাম আলোচনায়।

অন্যটি, ১৯৩২ সালেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যাপ্রচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত বিপ্লবী বীণা দাসের আদালতে উপস্থাপিত সেই বিখ্যাত স্টেটমেন্ট, যেখানে তিনি দৃঢ়তার সাথে স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন, যে এ ঘটনার দায় অন্য কারোর নয়, বরং একান্তই তাঁর। একটু উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। বীণা বলছেন, “I confessed that I fired at the Governor on the last Convocation Day at the Senate House. I hold myself entirely responsible for it. My object was to die and if I had to die, I wanted to do it nobly, fighting against this despotic system of government which has kept my country in perpetual subjection to its infinite shame and endless sufferings…” কেবল বাংলায় নয়, পৃথিবীর অন্যত্রও, রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর সচলতা, সক্রিয়তাকে যখন অনেকক্ষেত্রেই আড়াল করা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক বয়ানে, যেন এঁরা ছিলেন দলের নেতাদের ‘পাপেট’, কেবলই অন্ধ অনুগামী, এজেন্সিবিহীন, তখন বীণা দাসের বিবৃতিটি যেন সেই বয়ানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় সপাটে ।

এদিকে হয়েছে কী, আমি বাদে ক্লাসের আর সকলেরই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা পশ্চিমে। ফলে, দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলের ইতিহাস-জনজীবন সম্পর্কে শুধু যে জ্ঞানের অভাব তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই পূর্বানুমিত ধারণার ভিত্তিতে এক অবরুদ্ধ, পরাধীন, পশ্চাতপদ, দুর্বল নারীসমাজের চিত্রই ভাসে তার কল্পনায়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, ১৯৩০ এর দশকে বৃটিশ উপনিবেশায়িত বাংলার নারীদের সশস্ত্র বিপ্লবে অংশগ্রহণ, তাঁদের এই ধরণের লেখাগুলো প্রায় রূপকথার মতোই শোনাচ্ছিল ওদের কাছে। প্রথমে সংশয় থেকে বিস্ময়, শেষে বিস্ময় ছাপিয়ে মুগ্ধতা আর অপ্রকাশ্য ছিলনা।

কিন্তু শেষে এক কাণ্ড হলো। এদের মধ্যে একজন, স্বর্ণকেশী র., সবেতেই নাক-উঁচু, ভারি বিজ্ঞের মতো সব শুনে মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো, “টেক্সটগুলো ভালো, কিন্তু ওদের নামগুলো বাপু কেমন যেন, বড্ড খটোমটো!” ওর বলার ধরনটায় একটা কিছু ছিল, জাত্যভিমান আর উন্নাসিকতার এক তেতো মিশেল, তাই হেসেই উড়িয়ে দেয়া গেল না যেন। সারা ক্লাসেও হঠাৎ মৃদু অস্বস্তি। অপ্রস্তুত আমি প্রিসিলার সাথে চোখাচোখি হতেই দেখি, ক্রোধে-বিরক্তিতে প্রায় ফেটে পড়ছে। আমার কিছু বলতে হয় নি, শান্ত-সংযত কণ্ঠে জবাব ও-ই দিয়েছিল ⸺ এ ধরনের আপাত- বোকাটে কিন্তু আদতে ভারি গোলমেলে আলটপকা মন্তব্যের অসঙ্গতি ও অসৌজন্যতা ধরিয়ে দিয়ে। কৃতজ্ঞতায় হৃদয় পূর্ণ হয়ে উঠেছিল – প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্বর দায়িত্ববোধে ছায়া দিয়ে, মায়ায় জড়িয়ে, পথের দিশা দেখিয়ে চলা এই শিক্ষাগুরুর প্রতি।

দ্বিতীয় বর্ষেই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক কনফারেন্সে প্রপোজাল পাঠিয়ে ছিলাম আর তা নির্বাচিতও হয়েছিল। আমার তখন হাতে তেমন টাকা-পয়সা নেই, ফলে যাব না তেমনটা ধরে নিয়েই খবরটা প্রিসিলাকে জানালাম। ও কিন্তু সিরিয়াস, যাবে না মানে? তক্ষুনি বিভাগের ফাণ্ডের খোঁজ-খবর করে নিল, অতি দ্রুত টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল, তা দিয়ে অনায়াসে হয়ে গেল আমার আসা-যাওয়ার প্লেনের টিকেট, সাথে অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের যোগান। ফিরে এসে দেখা করে জানিয়েছিলাম অভিজ্ঞতা, দিয়েছিলাম আমার প্রবন্ধ উপস্থাপনের একটি ছবিও । লাল শাড়ি পরা সে ছবি ওঁর অফিসকক্ষের দেয়ালের বোর্ডে টাঙানো ছিল কিছুকাল ।

এ লেখা চলতে পারে পাতার পর পাতা। এবার বরং থামি। পাশ করে চলে এসেছি অনেক বছর হয়ে গেল, হিসেব করে দেখলে, এক যুগেরও বেশি। নানান কারণে-অকারণে আমার পিএইচডির যাত্রা শুরু করতে দেরিও হলো অনেক। তবু, আজ পিছন ফিরে দেখি, স্নেহসিঞ্চিত যে গভীর ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছিলাম বহুকাল আগে, মাথার ওপরে তা রয়ে গেছে আজো। আমার প্রতিটি পিএইচডির আবেদনপত্রের রেকমেণ্ডার লিস্টে প্রথম নামটি প্রিসিলার, কোনদিন এ নিয়ে দ্বিতীয়বার তাগাদা দিতে হয়নি, নিয়ম করে সবার আগে জমা পড়েছে ওরটিই। যেকোন ছোট-বড় অর্জন আজো ভাগ করে নিই, সযত্নে জমাই তাঁর আশীর্বাণী। আজকের এই ক্রূর, খল পৃথিবীতে এইসব দ্যুতিছড়ানো মণি-মানিকে “অন্তর মোর গোপনে যায় ভরে”– মনে মনে গেয়ে যাই শতবার “তোমার দানে, তোমার দানে, তোমার দানে”।

***

One thought on “ডুবায়ে রাখে মায়ায়’ : মৃত্তিকা সহিতা

  1. মৃত্তিকা সহিতা’র “ডুবায়ে রাখে মায়ায়” পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এটা শুধু স্মৃতির গল্প নয়—এ যেন নীরবে জ্বলা এক মানবিক আলোর কাহিনি, যা অচেনা বিদেশের একাকিত্ব, অস্বস্তি আর বর্ণবাদের কঠিন ছায়ার মাঝেও হঠাৎ করে আশ্রয় খুঁজে পায় একজন মানুষের মধ্যে। প্রিসিলা এখানে কেবল শিক্ষক নন, তিনি এমন এক উপস্থিতি—যে নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে দেয়, সাহস জোগায়, আর ভরসা হয়ে পাশে থাকে; আর সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর ভেতর জমে ওঠা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা পাঠক হিসেবে আমাকেও অদ্ভুতভাবে ছুঁয়ে গেছে। পড়া শেষে মনে হয়েছে, একটু থেমে যাই, নিজের ভেতরটা টের পাই—কারণ এই লেখা যেন মনে করিয়ে দেয়, সবকিছুর পরেও পৃথিবীতে এখনো মায়া আছে, মানুষ আছে।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে