এমন মাস্টারমশাই আর কই! : তন্ময় ভট্টাচার্য

আশেপাশের অনেক টেবিলের মধ্যে ছোট্ট একটা টেবিল, নিজেদের। ফিনফিনে সাদা কাপড় মোড়া। সেই টেবিলের তিনদিকে কাঠের বাউন্ডারি ওরফে পার্টিশন, সামনের দিক ফাঁকা। শুইয়ে রাখা কিংবা দাঁড় করানো অনেকগুলো বই। কিছু পত্রিকাও। বইমেলার এই ভরন্ত মরশুমে, শিক্ষক বলতে মাথায় আসছে কোনও ব্যক্তি নয়, টেবিলটিকেই— মাস্তুল-এর টেবিল, যার সঙ্গে সম্পর্ক দশ বছরেরও বেশি।

মাস্তুল প্রকাশন ও পত্রিকার কর্ণধার আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়— আমার বন্ধু। তারপরও, মাস্তুল আমার। আমাদের। দশ বছর ধরে, কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে মাস্তুলের টেবিলে বসতে বসতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে পারি না আর। এখন পর্যন্ত, মাস্তুল থেকে ছ’টি বইও বেরিয়েছে আমার; সবগুলি কবিতার বইয়েরও ঠিকানা ওই একই। ফলে, অধিকারবোধও নেহাত কম নয়।

তবে এখনও আমি শিক্ষার্থী। টেবিলের অপর প্রান্তে, বিক্রেতার জায়গায় বসে শিখি অনেককিছু। টেবিলের অবস্থান বদলে-বদলে যায় প্রতিবছর, আমার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বদলায় না। কতরকম পাঠকেরই যে দেখা পাই ওই প্যাভিলিয়নে! ছোট্ট ছেলে মায়ের হাত ধরে ঢুকছে, মা-র বক্তব্য, ‘এখানে সব বেঙ্গলি বুকস, চলো’— বলে ছেলেকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া— এ-ও যেমন দেখেছি, দেখেছি এমন পড়ুয়াকেও, যে শুধুই পড়ুয়া— নিজে লেখালিখির ধার না-ঘেঁষেও বছরের পর বছর কিনে নিয়ে যায় পাহাড়প্রমাণ বই। দেখেছি প্যাভিলিয়ন ধরে হেঁটে আসা তরুণ-তরুণীকে— আসবে কি এ-টেবিলে? দাঁড়াবে? কখনও দাঁড়ায়, কখনও না। এমন কত লোকের আনাগোনা গোটা চত্বর জুড়ে। কেউ বইপত্রে চোখ বুলিয়ে ভুরু কুঁচকে চলে যায়, কেউ আবার হাতে নিয়ে দ্যাখে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অর্ধেক বই পড়ে, তারপর না-নিয়ে চলে গেছে— এমন মানুষও রয়েছে। কারোর চিন্তা টাকার। ‘পরে কলেজ স্ট্রিট থেকে বেশি ছাড়ে নিয়ে নেব।’ কেউ আবার সেসব জটিলতায় না-গিয়ে, নতুন সব বই একসঙ্গে দিয়ে দিতে বলে। আমরা বিল তৈরি করি। ব্যাগে পুরে ক্রেতার হাতে তুলে দিই বই। হয়তো কেউ কোনও নির্দিষ্ট বইয়ের খোঁজেই এসেছেন, অথচ সে-বইটি নেই— এই পরিস্থিতি অস্বস্তির। করুণ মুখে জানাতে হয় অপারগতার কথা।

তবে বিক্রেতার পাশাপাশি, নিজের লিখিয়ে সত্তাটিকেই-বা অস্বীকার করি কী করে! মানুষজন আসুক, অন্যদের পাশাপাশি আমার বইও কিনুক— এই ইচ্ছা থেকে উত্তীর্ণ হতে পারলে তো হয়েই যেত! তবে একটি বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন— আমি টেবিলে আছি বলে, মুখ দেখে কেউ যেন বই না-কেনেন বা আমি নিজে যেন কাউকে আমার বই কিনতে না-বলি। এই যে সংযম, বাকিদের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখার এই শিক্ষাটুকুও পাওয়া টেবিল থেকেই। কত-কতবার মানুষজন এসে অন্যদের বই কিনে নিয়ে যান, আমার বই ছুঁয়েও দেখেন না। হাসিমুখে সেসব বই পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে, জিতে যায় টেবিলের সম্প্রীতিই। কখনও আবার এমন মানুষজন আসেন, যাঁরা আমাকে চেনেন না, আমিও তাঁদের না— অথচ বইতালিকায় ঢুকে পড়ে আমার বইও। নিজের পরিচয় না-দিয়ে নিজের বই ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই। কখনও কেউ আমার বই কিনতে এসেছেন দেখে, নিজেকে লুকিয়ে ফেলি টেবিলের আড়ালে। যতক্ষণ-না কেউ ডাকছে, মুখ তুলি না। আবার, কখনও কোনও পাঠক বইয়ে সই করে দিতে বললে, লজ্জা ও কুণ্ঠা ঘিরে ধরে। কারণ সহ-লেখকরা রয়েছেন আশেপাশেই। এবং ভেতরে-ভেতরে এ-ও জানি, তাঁদের বইয়ের তুলনায় আমার বই নস্যি। আনন্দ হয় বন্ধুদের বই বিক্রি হতে দেখলে। দিনশেষে বিল মিলিয়ে বিক্রির যে-হিসেব উঠে আসে, তাতে সবার বই ঘুরিয়েফিরিয়ে। একক আমি নই, সম্মিলিত যাত্রার শিক্ষা দেয় টেবিল। মনে-মনে ভ্রাতৃত্ববোধ। কমরেডশিপ।

কত-কত লিখিয়ে প্যাভিলিয়নে অতিথি হিসেবে আসেন। তাঁদের পরিচয় নেহাত ক্রেতা বা কবি-লেখক হিসেবেই। ‘নিজেদের টেবিল আছে’— এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত তাঁরা। আমার কাছে যেমন লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন ছাড়া বইমেলা অসম্পূর্ণ, কারোর কাছে হয়তো তা কোনও স্টল। কারোর কাছে তা গোটা বইমেলাই— বাঁধনহীন। মাঝে-মাঝে ভাবি, মাস্তুল যদি কোনোদিন টেবিল নেওয়া বন্ধ করে দেয়, কী হবে! ভয় করে। মাস্তুল আছে, তাই আমার এতগুলো দিন বইমেলায় যাওয়া প্রতিবছর। টেবিল না-থাকলে দু-একদিন সামান্য কিছুক্ষণের জন্য যাওয়া ব্যতিরেকে কী করব, কল্পনায় থই পাই না। আনন্দও কি এক থাকবে আর!

তাই, দিনের শেষে, সেই টেবিলই। সারাবছর ধরে বইমেলার অপেক্ষা মানে আদতে সেই টেবিলের কাছে যাওয়ারই অপেক্ষা। টেবিলের পাশে আড্ডা, টেবিলে বসা, টেবিল গোছানো। মাটিতে পা রেখে চলার শিক্ষা। এমন মাস্টারমশাই আর কই!

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে