বহুকাল হলো পৃথিবীতে আছি। নারীরূপে। নাম আছে আমার। তবে উল্লেখ্য নয়। কেননা, কোন নাম বলা যায়! পৃথক পৃথক নামের বিপরীতে সাড়া দিয়েছি অদ্যাবধি। যেন বা, প্রতিটি নামের বিপরীতে আলাদা মানুষ। তবু, হয়তো কোনো কোনো নামের প্রতি আছে পক্ষপাত। রয়ে গেছি যে সকল নামের বিপরীতে সর্বাধিক। তবে, নাম ডাকা থেমে যায়।
নামের কথা বলতেই মনে এলো, নারীর মৃত্যুঘোষণা হয় নামহীন। আমি সেই নারী। আলাদা কেউ নই। নারী এক সমগ্র সত্তা— পৃথিবীর জন্ম থেকে আজ, ভিন্ন ভিন্ন শরীরে অখণ্ড আত্মার, অখণ্ড দহন। এভাবেই অনুভবে আসে। আমি বিচ্ছিন্ন কেউ নই। অখণ্ড নারীসত্তার অভিন্ন প্রবাহ। কনকনে শীতের ভোরেও ফজর ফুরোবার আগেই হাড়ি পাতিলের ঠোকাঠুকি শব্দ বয়ে আনে হাওয়া। বিহারী ক্যাম্পের খুপড়ি দালানগুলোর ছাদ থেকে আসে। অচেনা কোনো নারীর হাতে ব্যত্যয়হীন সুরের রেওয়াজ বলে মনে হয়— সে নারী আমিই। আবার একটা লোহার কড়াই কিংবা অ্যালুমিনিয়ামের কেটলি কেনার আনন্দ সারাদিন বয়ে বেড়ানো সত্তাটিও আমি। আমি রাঁধি, চুল বাঁধি আধাখেচড়া। আমি জানি, দুর্গা যে সে-ও আলাদা কেউ নয়। সেও অভিন্ন।
কখনো হয়তো হতে চেয়েছিলাম দীপ্যমান, আলোকমুখর। সে চাওয়া মিলিয়ে গেছে। কেননা দিন ঝরে গেছে। দিন ঝরে গেলে মানুষ মৃত্যুর দিকে যায়। দিন ঝরে গেলে জীবনকে অর্থহীন বলে মনে হয়, কয়েকটা মাত্র পলকের যোগফল বলে মনে হয়। আলাদা কিছু ঘটে না মানবজীবনে। প্রত্যেকটি ঘটনা, প্রত্যেকটি পরিণতিই বীজগণিতের সূত্রের মতো। ছয় মাসে দাঁত, বারো মাসে হাঁটা, তেমনি প্রণয়-বিবাহ-বিরহ-বিচ্ছেদ-শীতলতা-দহন সকলই সূত্র মোতাবেক আবর্তিত হয়। রবীন্দ্রনাথ মরে যায়, সত্যজিৎ রায় মরে যায়, রবি শংকর মরে যায়, হৃদয়ে প্রবল আলোড়ন জাগানো ‘তোমাকে চাই’এর গাতক বৃদ্ধ হয়। যে সকল তীব্র প্রেমের কবিতা-গান-গল্পে আমাদের মন কঁকিয়ে উঠেছে জন্মানুক্রমে, সেইসবের গায়ক-নায়ক-গল্পকার-কবি মরে যায়। যে সকল হৃদয়ে এইসব প্রেম রক্তিম জ্বলে ছিল একদিন সেইসব হৃদয় বৃদ্ধ হয়, মরে যায়। শৈশবের প্রেমোৎসাহ ভরা হৃদয়ে চিরকালীন হয়ে গেঁথে যাওয়া উত্তম-সুচিত্রাও মরে যায়। যে সকল হৃদয়ের ঘাটে দাঁড় ফেলে ফেলে প্রবল আর্তিতে ‘তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার…’ গীত হয়, তারা হাওয়া-মাটি-জলে মিশে যায়। যদিও প্রতিটি ঘাটেই গীতা দত্ত ঢেলে রেখে যান চিরতাজা প্রেমের অলৌকিক আনন্দ-বেদনা। সেই কথা জানাতে জীবনানন্দ এসে বসেন পাশে, স্বগতোক্তির মতো বলে যান—
তবুও,— সিন্ধুর জল-সিন্ধুর ঢেউয়ের মতো বয়ে
তুমি চ’লে যাও প্রেম ;— একবার বর্তমান হয়ে ,—
তারপর, আমাদের ফেলে যাও পিছনে—অতীতে,—
স্মৃতির হাড়ের মাঠে ,—কার্তিকের শীতে !
অগ্রসর হয়ে তুমি চলিতেছ ভবিষ্যৎ লয়ে —
আজো যারে দেখ নাই তাহারে তোমার চুমো দিতে
চ’লে যাও !— দেহের ছায়ার মতো তুমি যাও রয়ে ,—
আমরা ধরেছি ছায়া ,—প্রেমেরে তো পারিনি ধরিতে !
ধ্বনি চ’লে গেছে দূরে ,— প্রতিধ্বনি পিছে প’ড়ে আছে ;—
কী থাকে! অনুভূতিরা কি থাকে প্রজাপতি হয়ে! গীতা দত্তের গলার কাঁপন কি প্রজাপতি হয়ে গেছে! জোয়ান বায়েজ আর বব ডিলানের যুগল ছবির সাদাকালো হু হু মায়া? প্রজাপতি হয়ে গেছে? সমস্ত কিছুকেই মনে হয় এক চিলতে পাতলা কাগজের মতো। উড়ে যায়। মিলিয়ে যায়। নশ্বরতাকে তীব্রভাবে চেনা হয়ে যায় লাবন্য ফুরিয়ে এলে। আয়নায় ওপাড়ে থাকে উচ্ছাসহীন, মোহনীয়তাহীন ঝুলে পড়া এক মুখ— যার দিন নিভে গেছে। আর নিকটস্থ মসজিদ থেকে ভেসে আসে মৃত্যুঘোষণা। প্রায় দিন।
এইসব ভাবনার পাঁকে পড়ে গেলে পৃথিবীতে জ্বলে থাকবার বাসনা উবে যায়। তখন প্রায় পরিত্যক্ত পুরোনো কাপড়ের মতো আলনার পেছনে ঢাকা পড়ে থাকাকে মনে হয় স্বস্তির। তখন হঠাৎ গৃহস্থ নারীকে খুব নিকটের মনে হয়। পুরোনো উপন্যাসের অনুজ্জ্বল নারী চরিত্রগুলো ভিন্ন এক চাপা আলো নিয়ে নিকটে এসে বসে। তারা কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়, তারা হয়তো বলিষ্ঠ নারী চরিত্রও নয়। তারা গৃহকর্মের ভেতর দিয়ে উপস্থাপিত হয়, সেখানেই অন্তর্হিত হয়। তারা পাঠক হৃদয়েও চিররূপে থাকে না। তাদের আত্মা সদা জেগে থাকে না অবচেতন কান্নায়। তাদের হাতে থাকে তেল-মসলার গন্ধ আর দাগ, নখগুলো ক্ষয়ে যাওয়া। তাদের হৃদয়ে কেবল বড়ো রাস্তা থাকে, গলি ঘুপচি থাকে না। তারা খুব প্রাকৃতিক— জন্মে, মরে যায়। গাছের পাতা যেমন। নামের অমরত্বকেও আজকাল অপ্রাকৃতিক বলে মনে হয়। মনে হয়, যখন মরে যাব তখন নামটিও সাথে নিয়ে মহাসময়ের সাথে মিশে যেতে চাই। অগণিত অগণিত নাম মুছে যাওয়া নারীদের মতো। মুছে যাওয়াই প্রকৃতির ধর্ম।
ঐ পুরোনো উপন্যাসের নারীরা, তেল-মসলার গন্ধমাখা নারীরা শীত আসবার আগে লেপ রোদে দেয়, আচার করে, লুচি ভাজে, ডালের বড়ি রোদে শুকোয়, ঘরবাড়ি ঝকঝকে তকতকে করে রাখে— ওতেই তাদের আনন্দ। তাদের হৃদয়ে জটিল কোনো গলি ঘুপচি নেই যেমন তেমনি সদর দরজা ছাড়া কোনো জানালাও নেই, নেই অন্য কোনো পৃথিবী নেই। তবু হয়তো তাদেরও কান্না পায়, হয়তো কখনো কখনো তাদেরও অশ্রুফোটা উনুনের আগুনে পুড়ে যায়। তথাপি তারা প্রবাহিত হয়। নিত্যকর্মে।
আমি— সেই প্রবাহ। বিস্তৃত কোনো উপন্যাসের অনুজ্জ্বল ক্ষীণ কোনো চরিত্র। হয়তো কাব্য করে বলা যেত— আমি কৃষ্ণা, শুধু নারী এক। দ্রেীপদীর দীপ্যমানতার অতলে চাপা পড়া কৃষ্ণাও বুঝি নারীসত্তার অভিন্ন প্রবাহের ভেতর মিলে যাবার জন্য অধীর হয়েছিল কখনো!
হয়তো ঐ প্রবাহের কোনো বুদবুদের ভেতর থেকে কারো কখনো ‘খানকতক লুচি’ ভাজতে ভাজতে `হুয়ে ফাসলে, ঝুটে সিলসিলে…টুটে হুয়ে দিল যায়ে কাহা…’ র মতো কোনো গানের কান্না কখনো দূর থেকে ভেসে এসে বুক বিদীর্ণ যেত। হয়তো রক্তও ঝরত। তারা টের পেত না। কিংবা টের পাবার মুহূর্তেই উঠোনে কেঁদে উঠত শিশুসন্তান।
