নিকষকালো মেঘে ঢাকা আকাশ। গত কয়েকদিন ধরে প্রকৃতির শিরা বেয়ে একটানা বৃষ্টি ঝরছে। দিনগুলো যেন এক অতলান্ত অন্ধকারে ডুবে আছে। মনে হয়, পৃথিবীটাও যেন একটু ধীরে চলছে। সূর্যের মুখ দেখা না গেলেও ভ্যাপসা গরম লাগছে। জানালার পাশে চেয়ার টেনে হাতের কাছে রাখা ‘শীর্ষেন্দুর শ্রেষ্ঠ গল্প’ বইটি চোখের সামনে মেলে ধরি। বৃষ্টিতে নিশিকান্ত, গল্পটির প্রথম লাইন ‘কেচ্ছা কেলেংকারির মতো বৃষ্টি হচ্ছে কদিন’ লাইনটি পড়ে আকাশের দিকে তাকাই। আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির গতির সঙ্গে কেচ্ছা কেলেংকারির সম্পর্ক কেমন, বোঝার চেষ্টা করি। চরাচরব্যাপি বৃষ্টির গতি কেলেংকারির মত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। লেখক বোধহয় এমন ভাবনা হতেই বাক্যটি লিখেছেন। লেখকের ভাবনার সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হতে পেরে মনে মনে খুশি হই। জমাট মেঘে ঢাকা মধ্যাহ্নের আকাশটি যেন মহাকালের মতো আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি এবং আকাশ, মাঝখানে বৃষ্টিভেজা দিন। নাওয়া খাওয়া এখনো কিছুই হয় নি। ঘুমের জন্য এখন অসময় হলেও আমার দু-চোখ আপনা হতেই বুঁজে আসছে। ঘুম তাড়াতে কিছুটা সময় রুমের এদিক-ওদিক পায়চারী করি।
অঝোর বৃষ্টি ঝরছে। দিনের শরীরে ঝুপঝুপ বৃষ্টি ফোঁটা যেন কোনো দক্ষ চিত্রশিল্পীর মতো ছবি আঁকছে। এ ছবি দেখা যায়, ধরা যায় না। বারান্দার গ্রীলে বৃষ্টি ফোঁটা সবুজ ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা শিশিরের মতো ঝুলে আছে। আমি হাত বাড়িয়ে আদর করে ওদের ছুঁয়ে দিই। আমি ওদের ছুঁয়ে দিতেই ওরাও আমাকে পরম মমতায় ছুঁয়ে যায়। কিছুটা সময় আমরা একে অন্যকে ছুঁয়ে থাকি, চুপচাপ। কী অপার সুখ!
বারান্দায় দাঁড়িয়ে টের পাই বাইরে বৃষ্টির গতি আরো বেড়েছে। আকাশের কী এমন শূন্যতা? কেন এমন আর্তনাদে ফেটে পড়ছে? কোন তীব্র দহনে আকাশ পুড়ছে? কে জানে। মাথা হতে আকাশের ভাবনা ঝেড়ে আমার বৃষ্টিপ্রবণ মন চোখ বুঁজে বৃষ্টির মধ্যে ডুবে থাকে। চোখ বুঁজতেই সূঁচালো বৃষ্টির মধ্যে যেন দেখতে পাই, রায়হানের হাতজোড়া আমার মুখের সামনে। রায়হান আমার খেলার সাথী। আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি, স্কুলে গিয়েছি। এমন কোনো এক বৃষ্টিভেজা দিনে রায়হান লাজুক মুখে আঁজলা ভরে বেলি ফুল দিয়ে প্রথম বন্ধু হবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমি চোখ বুঁজে স্পষ্ট যেন দৃশ্যটি দেখছি, আর বেলি ফুলের মৌ মৌ ঘ্রাণে তলিয়ে যাচ্ছি।
রায়হান মাথায় আসতেই এলাচ চায়ের তৃষ্ণা জাগে। এই সময় ধোঁয়া ওড়া এক কাপ এলাচ চা হলে মন্দ হয় না। রায়হান খুব এলাচ চা ভালোবাসতো। কলেজে পড়া দিনগুলোতে ওর সঙ্গে টং দোকানে এলাচ চা পান করে আমারও প্রিয় হয়ে উঠেছে। চা হাতে বারান্দায় এসে বসি। ভুলে যাওয়া স্মৃতি জাগিয়ে দেয়ার এক অদ্ভূত ক্ষমতা রয়েছে বৃষ্টির। খুব মনে পড়ছে রায়হানকে। চা খাওয়ার সময় রায়হানের ঠোঁটে বাচ্চাদের মতো চা লেগে থাকতো, আমি টিস্যু দিয়ে মুছে দিতাম। এ নিয়ে আমি হাসাহাসি করলে ও বলতো, ‘ কিছু চা রাখি ঠোঁটের ভাঁজে, কিছু রাখি ঠোঁটে।’ রায়হানের প্রখর বুদ্ধি ছিল। ওর সঙ্গে কথায় কিংবা যুক্তিতে সর্বদা হেরে যেতাম। বর্ষা ঋতু ওর প্রিয় ছিল। বর্ষার এমন বৃষ্টিমুখর দিনে রায়হান খুব আড্ডায় মজে থাকতো। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে এলাচ চা সঙ্গে সরিষার তেল, লাল পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা দিয়ে চানাচুর -মুড়ি মাখিয়ে খেত। ঝমঝমে বৃষ্টি নামার আগেই রায়হান কেমন করে যেন বৃষ্টির গন্ধ পেতো, অমনি চঞ্চল হয়ে উঠতো।
মনে পড়ছে সেদিন বিকেলের কথা। গ্রামের টং দোকানের বারান্দা থেকে খরগোশের মত লাফাতে লাফাতে রায়হান উঠে এসেছিল আমাদের ঘরের বারান্দায়। কাকের মত গায়ের জল ঝাড়তে ঝাড়তে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। বললো, চল কাগজ কেটে নৌকা বানাই। সে কাগজের নৌকা জলের স্রোতে ভাসিয়ে দিই। ১৯৯৮ সাল, সেবারের বন্যায় জলের স্রোত প্রায় উঠে এসেছে বারান্দা অবধি। যে ভাবনা সে কাজ। দু’জন মিলে রঙ বেরঙের কাগজ কেটে নৌকা বানাই। নৌকাগুলো ভাসিয়ে দিই বৃষ্টিজলে। বাতাসের তোড়ে কোনটা ডুবে যায়, কোনটা কাত হয়ে থাকে, কোনটা আবার তরতর ভেসে যেতে থাকে। আমরা দু’জন একসঙ্গে সে অভূতপূর্ব দৃশ্যের দিকে বিহ্বল হয়ে চেয়ে থাকি।
জল থৈ থৈ বর্ষা ঋতুর ভুরভুর গন্ধ রায়হানকে বিভোর করে তুলতো। রায়হানের পাল্লায় পড়ে আমিও চঞ্চল হয়ে উঠতাম। বর্ষা দিনে বৃষ্টিতে ভিজে কত যে জ্বর-সর্দি বাঁধিয়েছি, হিসেব নেই। রায়হান খুব যত্মশীল ছিল আমার প্রতি। একবার বৃষ্টিতে ভিজে ভীষণ কাশি হলে রায়হান তাল মিছরি নিয়ে আসে। তাল মিছরি দেখে আমার মা তো অবাক। কারণ, কয়েক সপ্তাহ আগে উনি পায়েস রান্নার জন্য বাজারের কয়েকটি দোকান খুঁজে তাল মিছরি পান নি। আমাদের দু’জনকে প্রতিযোগিতায় মেতে তাল মিছরি কড়মড় করে খেতে দেখে মা বললেন, মিছরি মুখে রেখে খেতে হয়। কে শুনে মায়ের কথা। আমরা আয়েশ করে ছোট বাচ্চার মতো দাঁত দিয়ে ভেঙে তাল মিছরি খেয়েছি।
আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা জায়গা ছিল। শুকনো মৌসুমে সেখানে ধানের চাষ করা হলেও বর্ষা মৌসুমে জায়গাটি বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর এক বিলে রুপান্তরিত হয়। এ সময় পাড়ার দূরন্ত বাচ্চারা এখানে সাঁতার কাটে। একদিন রায়হান এসে বললো, মাঠের অঢেল জলরাশিতে নৌকায় ঘুরতে যাবে সে। সেদিনও ঝুম বৃষ্টি ছিল। বর্ষার ভেড়া ভেঙে বৃষ্টি ছাপিয়ে আমরা দু’জন চলে যাই মাঠের মাঝখানে। রায়হান এর আগেও এমন সব অদ্ভূত কান্ড ঘটিয়েছে অনেকবার। হয়ত ঝুম বৃষ্টিতে নয়ত গাছের মগডালে বসে শূন্যে পা ঝুলিয়ে ও আমাকে নানান দেশের লোককাহিনী, রূপকথার গল্প শোনাতো। সেই সব মুহূর্তে ওর প্রতি আমার মুগ্ধ চাহনির রশ্মিতে মেঘলা দিনেও প্রকৃতির বুকে যেন আলোর ঢেউ খেলে যেত। ওর এমন পাগলামি আমার ভালো লাগতো। তো, সেদিন মাঠের মধ্যখানে গিয়ে কোন কথা না বলে রায়হান আমার হাত ধরে চুপচাপ ধ্যানীর মতো মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
‘ আমার প্রানের প্রান পাখি
আমার হিরামন পাখি
তোরে কোথায় রাখি
পাখিরে সবই মিছে আর ফাঁকি… ‘
আমাদের পাশ ঘেঁষে এক অচেনা মাঝি পল্লীগীতিটি গাইতে গাইতে চলে যায় দূরে। লোকটি দৃষ্টিসীমা হতে লীন হয়ে গেলে রায়হান পল্লীগীতিটি কন্ঠে তুলে নেয়। ওর গানের গলা চমৎকার। অন্যরকম এক আবেশে আমি আকাশের দিকে মুখ তুলে চোখ বুঁজে ওর গান শুনতে থাকি।
আকাশে তীব্র বজ্রপাতের শব্দে আমাদের ধ্যানের মধ্যে ছেদ পড়ে। ইতোমধ্যে, বৃষ্টিও কমে আসে। বর্ষার টলটলে জলে আমাদের অভূতপূর্ব সময়ের স্মৃতি চিহ্ন রেখে জীবনের হরেক রঙের ছবি আঁকতে আঁকতে আমরা সেদিন ফিরে আসি স্থলে।
মানুষের জীবন স্মৃতির আধার বৈ অন্য কিছু নয়। স্মৃতির চেয়ে যেমন বড় সম্বল নেই জীবনে, তেমনি শেষ বলেও সত্যিই কিছু নেই জগতে। কিছু স্মৃতি মানুষকে হঠাৎ চুপ করিয়ে দেয়। বৃষ্টির শব্দের ভেতর রায়হানের স্মৃতি কিছুটা সময় আমাকে বাস্তবতা হতে বিচ্ছিন্ন করে জীবন হতে বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে তোলে। এই যান্ত্রিক শহরে মানুষগুলো হেঁটে নয় রীতিমতো দৌড়াচ্ছে, সেই শহরে আমার সময়গুলোও ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা। ঘরের পড়ে থাকা অসমাপ্ত কাজের দিকে তাকিয়ে আমার বড় ক্লান্ত লাগছে আজ। আমি এবং আমার সময় যেন থেমে থাকে। পা জোড়া সামনে চলছে না। পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে আসে। ভিতরে ক্লান্তি যতই চেপে ধরুক না কেনো দায়িত্ব হতে তো নিস্তার নেই। আষাড়ের আকাশ এখনো কালো মেঘে ছেয়ে আছে। জানালার ওপাশে টুপটুপ বৃষ্টি, এপাশে আমি আর মনের ঘরে বেজে ওঠে রবীন্দ্রনাথ।
‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে
পাগল আমার মন জেগে উঠে… ‘
