বৃষ্টি মাথায় ছাতা ★ নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

ছোটোবেলায় আমার কোনোদিন কোনো ছাতা ছিল না। এই কথাটা যখন এই মাঝবয়সে এসে ভাবি, তখন বুকের ভেতর কেমন হাহাকার ভর করে। আমার বাবা সরকারি চাকরি করত, ফরেস্টে। ফলে বনপাহাড়েই আমার জন্ম। জন্মেছিলাম বর্ষা শেষে, শরৎকালে। কিন্তু ভাদ্রের সেই রাত্রিবেলাও বৃষ্টি ছিল, মা বলেছিল। তাই ছাতা নয় বৃষ্টিকে ভালোবেসেছিলাম।

ছোটোবেলায় একটা খুব আবছা মলাটের খাতার কথা মনে পড়ে। নীল রঙের মলাট, বৃষ্টিতে ভিজে তার কোনাগুলো কুঁকড়ে চটা উঠে গিয়েছিল। সেই খাতার প্রথম পাতায় পেনসিল দিয়ে হিজিবিজি করে একটা ঘর আঁকা ছিল, ঘরের চালে কোনো খড় ছিল না, টিন ছিল না, কেবল কতিপয় বাঁকা লাইনে আকাশ থেকে জল নেমে আসছিল। তখন তো জ্যামিতি শিখিনি, জানতাম না যে সোজা দাগকে সরলরেখা বলে। আমার কাছে মনে হত, আকাশ থেকে যে জল ঝরে পড়ে, তার কোনো নির্দিষ্ট দিক নেই, কোনো জ্যামিতি নেই। সে এক অদ্ভুত খেয়ালে এদিক-ওদিক হেলে পড়তে পড়তে মাটির বুকে নামে। আমার বয়স তখন কত হবে? চার বা পাঁচ বছর হবে হয়তো।

ছোটোবেলায় আমার কোনো ছাতা ছিল না। তবে আমাদের ছিল। আমাদের ছিল মোট তিনটা ছাতা। একটা বাবার, একটা বোনদের। আর একটা সবার। বাবার ছাতাটার ডাঁট ছিল মেটাল, কাপড় ছিল কালো। বোনদের ছাতা ছিল রঙিন, লাল, নীল, হলুদ সবুজ কাপড়ে ছাওয়া কাঠের ডাঁটের। আর কমন ছাতাটা ছিল কালো কাপড়ের জোড়াতালি দেওয়া কালো, কাঠের ডাঁট। আর আমরা বাড়িতে অনেকজন মা, বাবা, ভাই, বোন, ছোটো চাচা-সহ অনেকেই।

আমি যখন ইশকুলে যাওয়া শুরু করি। তখন আমার বাবার চাকরি নেই। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত, টানা পাঁচবছর বাবা চাকরিহীন। বাবাকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে, ঘুষ না খাওয়ার অপরাধে। বাবা করে দিল ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে মামলা। সরকারের বিরুদ্ধে সেই মামলায় জিততে বাবার লেগে গেল ৫ বছর। এই ৫ বছর আমাদের কাটল ভয়ানক অভাবে। সেই অভাবের ভেতরও যে আমাদের পরিবারের ১১ সদস্যের জন্য তিনটা ছাতা ছিল, ভাঙাচোরা হলেও, সেটা আমার কাছে এখনো বিস্ময়।

আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগত। ফলে ছাতা না নিয়েই ইশকুলে যাওয়া অভ্যাস করে ফেললাম বর্ষাকালে।

বৃষ্টি নামলে রাস্তাঘাট আর বাজারের মানুষ কী করে? ছাতা খুলে মাথার ওপর তুলে ধরে। আমার ছোটোবেলায় মানুষেরা তাদের আলমারি থেকে পুরোনো, সর্ষে তেলের গন্ধ ছড়ানো কালো ছাতাগুলি বের করে, কালো কালো ছাতা, কাঠের ডাঁটের, স্টিলের গিল্টি করা পাতলা লোহা বা টিনের ডাঁটের ছাতা, অ্যারাবিয়ান ছাতা, ক্যারাবিয়ান ছাতা, অ্যাটলাস, মান্নান, কেসি পাল, শংকর, বৈশাখী আরও কত কী যে ছাতার নাম, ছাতার নাম ছাতামাথাপাতা। স্প্রিংয়ের খটখট শব্দে সেই ছাতা যখন মাথার ওপর মেলে ধরত মানুষেরা, আমার মনে হত, আহা, মানুষটা কেমন নিজের তৈরি একটা ছোট্ট অন্ধকূয়ার ভেতর উলটা হয়ে মাথা ঢুকিয়ে দিল! আকাশটাকে সে আর দেখতে পাচ্ছে না। আকাশের কান্না, আকাশের আনন্দ, মেঘের গম্ভীর ও গম্ভীরা ডাক, ডম্বর, মল্লার, সবকিছু থেকে সে নিজেকে আড়াল করে নিল! আহারে আহারে!

ছোটোবেলায় আমার কোনো ছাতা ছিল না, কারণ ছাতা থাকলে তো আর বৃষ্টির আদিম ঘ্রাণ বুকের গভীরে টেনে নেওয়া যায় না। ছাতা এক ধরনের দেওয়াল, ছাতা হল সিলিং, দুপুরবেলার ছাত নয়, ছাত মানে ছাদ, এই বানান একদা আমার লিখতে ভালো লাগত। কোনোদিন ভর দুপুরে হুহুপাখির বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাসের কালি নিয়ে আমার অঙ্কখাতার পাতায় লিখেছিলাম, আমাকে নেয় না কোনো দুপুরবেলার ছাত।

শহরের বৃষ্টি আমার ভালো লাগে না। তবু আগের মতোই বৃষ্টিতে ভিজি। এখনো সেই ছাতারহিত ছোটোবেলার ‘আমি’কে বুকের ভেতর নিয়ে ঘুরে বেড়াই। শহরে একটু বৃষ্টি হলেই নর্দমার নোংরা জল উপচে রাস্তায় চলে আসে। রিকশার চাকা থেকে কাদা ছিটকে এসে লাগে কাপড়ে। চারদিকে জ্যাম, মানুষের চিৎকার, হর্নের শব্দ। যান্ত্রিক নরকেও কিন্তু বৃষ্টির এক নিজস্ব জাদু আছে। যখন আকাশটা কালো হয়ে আসে, বিল্ডিংগুলির ওপর এক অদ্ভুত ছায়া পড়ে। আমি তখন ট্রাফিক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে দেখি, শত শত মানুষ তাদের রঙিন ছাতাগুলি খুলে এক একটা মাশরুমের মতো রাস্তার ওপর ভাসিয়ে দিয়েছে। কেউ নীল, কেউ লাল, কেউ বা কুচকুচে কালো ছাতার নিচে মুখ লুকিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে। তারা কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। ছাতা যেন তাদের একেকজনকে একেকটা আলাদা দ্বীপে পরিণত করেছে। আর আমি? আমি তখনো দাঁড়িয়ে থাকি সেই ট্রাফিক লাইনের ধারে। আমার হাত দুটো খোলা থাকে, চোখ দুটো থাকে আকাশের দিকে। মাথার ওপর থেকে যখন সাদা মেঘের দল রোদের তীব্র দংশনে ছিঁড়ে গিয়ে জলের কণা হয়ে ঝরতে থাকে, তখন আমার মনে হয়, এই শহরের সমস্ত নোংরা, সমস্ত ক্লান্তি আমাকে ছুঁতে পারছে না।

মানুষ ভিজতে ভয় পায়। কেন পায়? সে কি কেবলই সর্দি-কাশি কিংবা জ্বরের ভয়? না, তা নয়। মানুষ আসলে ভয় পায় তার ভেতরের আসল মানুষটাকে আবিষ্কার করতে। কিন্তু কতক্ষণ নিজেকে বাঁচানো যায়? মেঘডম্বর যখন তীব্র হয় বৃংহনের মতো, যখন হাওয়া কিংবা ঝড় এসে চাবুক মারে চারিদিকে, তখন সেই ছাতাগুলি উলটে গিয়ে কঙ্কাল হয়ে পড়ে। তখন বড়ো করুণ দেখায় সেই ছত্রধারীদের। তারা তখন ছেঁড়া ছাতা হাতে নিয়ে আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক ছোটে, অথচ তাদের ঠিক পাশ দিয়েই কোনো এক ছাতারহিত আমি শিস দিতে দিতে হেঁটে চলে যাই আমার বৈকুণ্ঠর দিকে। যে একবার সমস্ত ভিজে যায়, তাকে ভেজানোর সাধ্য আর কোনো ঝড়-বৃষ্টির থাকে না। এই যে ভয়হীনতা, এই যে মুক্তি, তা কেবল একজন ছাতাহীনই অনুভব করতে পারে।

আমার শরীরের রক্তে মিশে আছে বাদলের আদিম গান। ছোটোবেলা থেকে আমার কোনো ছাতা ছিল না বলে আমি সারা বর্ষা বৃষ্টিতে ভিজতাম। কোনোদিন আমার সর্দি হয়নি, জ্বর হয়নি। আমার ভেতর থৈ থৈ রোদ লুকিয়ে থাকে। বৃষ্টি যখন আমার শরীরে পড়ে, তখন আমার ভেতরের  রোদ আর বাইরের জল মিলেমিশে এক অদ্ভুত রামধনু তৈরি করে।

বৃষ্টির ভেতর আমি আমার হাত দুটোকে মেলে ধরি। বৃষ্টির জল এসে আমার হাতের রেখাদের ভিজিয়ে দেয়। মনে হয়, আমার সমস্ত অতীত, সমস্ত ভুল আর গ্লানি ওই জলের স্রোতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। তখন আর কোনো ছাতার প্রয়োজন হয় না। ছাতা মাথায় দিয়ে যারা গাছের পাশে দাঁড়ায়, তারা তো আসলে এক একটা নকল গাছ। আসল গাছ তো সে-ই, যে তার সমস্ত পাতা মেলে দিয়ে ঝড়ের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যার কোনো ছাতার প্রয়োজন হয় না, কারণ সে নিজেই এক একটা ছাতা, যা অন্যকে আশ্রয় দেয়।

আমি একবার লিখেছিলাম, ছাতা হলো পৃথিবীর সবথেকে অশ্লীল জিনিস। কথা সত্য। বৃষ্টিকে ভিজতে ভিজতে এই সত্য আমি উপলব্ধি করেছিলাম। ছোটোবেলাতে ছাতাকে এক পর্যায়ে আমি শত্রু ভাবাও শুরু করলাম একদিন। তখন আমি ফোরে পড়ি। ১৯৮৯ সালের বর্ষাকাল। আমার সঙ্গে বেলাল পড়ত একই ক্লাসে। তার বাবা সি অ্যান্ড বি তে চাকরি করত। বেলালের সঙ্গে আমার প্রায় বন্ধুত্ব হয়ে যাচ্ছিল। একদিন দেখি বেলাল খুবই সুন্দর একটা ছাতা নিয়ে ইশকুলে এল। রঙিন ফুলের মতো ছোট্ট একটা ছাতা, লাল নীল হলুদ বেগুনি বেনিআসহকলা রামধনু রঙের ছাতাফুল মাথায় দিয়ে বৃষ্টির ভেতর। বেঞ্চগুলির একদম পেছনের একটুখানি ফাঁকা জায়গায় মেঝেই রাখল ছাতাটা, যেন জল ঝরে যায়। তারপর সামনের দিকে দ্বিতীয় সারিতে গিয়ে বসল সে। আমি বরাবরই ব্যাকবেঞ্চার। পেছনের দিকে বসতেই ভালো লাগত যদিও স্যার ডেকে সামনে না বসায় আমি পেছনের দিকেই বসতাম।

সেদিন বেলালের ছাতাটা একদম আমার হাতের নাগালে ছিল। আমি পেছনে হাত নিয়ে গিয়ে পেনসিল দিয়ে বেলালের ছাতার কাপড়ে একটা বড়ো ফুটো করে দিলাম। আমার প্রবল আনন্দ হল মনে।

সেইদিন সারাদিন বৃষ্টি। বিকেলে আরও বেশি। ঝম ঝম, ঝম ঝম, যেন বা বব ডিলানের আ হার্ড রেইন গনা ফল টাইপ বৃষ্টি। ছুটির ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে আমি পলিথিনে বইগুলি মুড়িয়ে বুকে চেপে ধরে ঝম ঝম বৃষ্টির তলে নেমে বাড়ির পথ ধরলাম। অনেকটুকু পথ ছিল, এক মাইল তো হবেই। সি অ্যান্ড বি ডাকবাংলোর কাছাকাছি আসতে হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমার পেছনে বেলাল। তার রঙিন ছাতার তলায়, ফুটোওয়ালা রঙিন ছাতা। তার হাতে একটা বরই গাছের চিকন ডাল। আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। তার মানে সে জেনে গেছে। কেমন করে জানল? নিশ্চয় কেউ দেখে ফেলেছিল আর তাকে বলে দিয়েছে।

আমি মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালাম, সেটাই হল কাল। যখন দৌড় দেব, তখনই বেলাল প্রায় ঝাপিয়ে পড়ল আমার ওপর। বরই গাছের চিকন ডালটা দিয়ে এমন মাইরটা দিল, কাঁটার আঘাতে প্রায় ক্ষত-বিক্ষত হয়েই শেষ পর্যন্ত দৌড়ে সটকে পড়তে পারলাম। বৃষ্টিতে রক্ত ধুয়ে গেল।

ছাতার কারণে সেই আট বছর বয়সে বেলাল আমাকে যেভাবে মেরেছিল সেই রাগ আমি পুষে রেখেছিলাম অনেক বছর, কেমন করে তার ওপর প্রতিশোধ নেব প্রতি ছয়মাস পর পর লিখে রাখতাম, যদিও পরের বছর বেলালের বাবা বদলি হয়ে গিয়েছিল বলে সেও চলে গেল।

আমার ছাতা ছিল না, তবু ছাতা ও বৃষ্টি নিয়ে আরও কত স্মৃতি যে আমার আছে! এইখানে এইবেলা একটা মাত্র স্মৃতির কথা লিখে রাখলাম।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে